কীভাবে কাজ করে পারমাণবিক ঘড়ি?
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন পরমাণুর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছন্দ রয়েছে। পরমাণুর একটি ইলেকট্রন তার চলাচলে একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক তৈরি করে। পারমাণবিক ঘড়িতে একটি লেজারকে সেই নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়। সেটিই হয়ে ওঠে অত্যন্ত নির্ভুল সময়ের হিসেব।
নিখুঁত সময়ের হিসেবের জন্যে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন সিজিয়াম (Cesium) ঘড়ি। দশকের পর দশক ধরে এই ঘড়িই আন্তর্জাতিকভাবে এক সেকেন্ডের সংজ্ঞা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সিজিয়াম ঘড়ি GPS এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সময় সমন্বয়েও ব্যবহৃত হয়। তবে সময় আরও নিখুঁতভাবে মাপতে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক ঘড়িতে ইটারবিয়াম, স্ট্রনশিয়াম ও অ্যালুমিনিয়াম-এর মতো মৌল ব্যবহার করা হচ্ছে।
গুগলে আরও খোশখবর( KHOSHKHOBOR)
সবচেয়ে নিখুঁত পারমানবিক ঘড়ি
বিজ্ঞানীদের হিসেব বিরল ধাতু লুটেটিয়াম (Lutetium) দিয়ে তৈরি দুটি পারমাণবিক ঘড়িই এখন লেজার-ভিত্তিক পারমাণবিক ঘড়ির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম ত্রুটির। আগের সেরা রেকর্ডের তুলনায় তাদের অনুমান করা ত্রুটি প্রায় চার গুণ কম। দেখা গেছে তাপমাত্রা এবং আশপাশের চৌম্বক ক্ষেত্র সাধারণত পারমাণবিক ঘড়ির গতিতে সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু গবেষকদের মতে, প্রচলিত ঘড়ির ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে লুটেটিয়াম এই দুই প্রভাবের প্রতিই সবচেয়ে কম সংবেদনশীল।
প্রতিটি লুটেটিয়াম ঘড়ির মোট অনুমান করা ত্রুটি প্রায় ১০ কুইন্টিলিয়নে ১ অংশ। অর্থাৎ দশমিকের পরের ১৯তম ঘরের মাত্রায় ত্রুটির সম্ভাবনা। অর্থাৎ লুটেটিয়ামের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—পরিবেশের কিছু পরিবর্তন তার সময় মাপার ওপর খুব কম প্রভাব ফেলে।
নির্ভুল ঘড়ির পরীক্ষা কীভাবে?
আগেই বলা হয়েছে একটি ঘড়ি যখন নিখুঁত তথন তার নির্ভুলতা যাচাই হবে কী করে? কেন না তাকে যাচাই করার মতো আর কোনও ঘড়ি থাকে না। এখানেই পদার্থবিদরা একই ধরনের দ্বিতীয় একটি ঘড়ি তৈরি করে দুটির সময় মিলিয়ে দেখেছেন। বিরল ধাতু লুটেটিয়াম (Lutetium) দিয়ে তৈরি দুই পারমাণবিক ঘড়ি দিয়ে এই পরীক্ষা করা হয়েছে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন সিঙ্গাপুরের সেন্টারে ফর কোয়ান্টাম টেকনোলজিস (CQT)-এর ড. মারে ব্যারেট। প্রতিষ্ঠানটি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর (NUS)-এর সঙ্গে যুক্ত। দুটি ঘড়িই একই গবেষণাগারে রয়েছে এবং তাদের একে অপরের সঙ্গেই তুলনা করা হয়েছে।
নির্ভুল ঘড়ির পরীক্ষার ফল কী?
প্রায় ১২ দিন ধরে গবেষকরা দুই ঘড়ির মধ্যে ১১টি পরীক্ষা চালান। সব মিলিয়ে পরীক্ষার সময় ছিল প্রায় ২০০ ঘণ্টা। আর দুটি ঘড়ির সময়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ১০ কুইন্টিলিয়নে ৫.৭ অংশ। পরীক্ষায় দুই ঘড়ির প্রকৃত পার্থক্য প্রায় শূন্যের কাছাকাছি পাওয়া যায়।
এটি একটি নতুন রেকর্ডের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে যেসব অত্যন্ত নির্ভুল ঘড়ি দ্বিতীয় একটি ঘড়ির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল, তাদের কোনওটির অনুমান করা মোট ত্রুটি ১০ কুইন্টিলিয়নে ১ অংশের নিচে ছিল না। ড. মারে ব্যারেট জানিয়েছেন যে তাঁদের তৈরি ঘড়িটিই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল ঘড়ি। এক দশকেরও বেশি সময় আগে লুটেটিয়াম নিয়ে কাজ শুরু করে ব্যারেটের দল । তাঁদের ধারণা ছিল, এই মৌলটি অত্যন্ত নির্ভুল সময় মাপার কাজে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।
ভবিষ্যতের ঘড়ি ও নিখুঁত সময়
বিজ্ঞানী ব্যারেটের মতে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশেও লুটেটিয়াম ঘড়ি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারে। এমনকি পৃথিবীর উষ্ণতম স্থান ডেথ ভ্যালি থেকে অ্যান্টার্কটিকার অত্যন্ত ঠান্ডা অঞ্চলে নিয়ে গেলেও ঘড়িটির স্থিতিশীলতা বজায় থাকার কথা। সেক্ষেত্রে লুটেটিয়াম ঘড়ির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনও বাকি—ল্যাবরেটরির বাইরে নিয়ে গিয়ে অন্য গবেষণাগারের সেরা ঘড়ির পাশে বসিয়ে তুলনা করা। সে পরীক্ষাই শেষ পর্যন্ত বলবে লুটেটিয়াম ঘড়ি বাস্তব পরিবেশেও বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল ঘড়ি হিসেবে তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে কি না।
তথ্যঃ আর্থ ডট কম
[ছবি সৌজন্যঃ খোশখবর সাইটে ব্যবহৃত ছবিগুলি নেওয়া হয়েছে পিক্সাবে, আনস্প্ল্যাস, ফ্রিপিক, উইকিমিডিয়া কমন্স, গুগল ফটো সহ বিভিন্ন নিজস্ব সূত্র থেকে]
[ জ্ঞান বা তথ্যের কোনও কপিরাইট হয় বলে আমরা মনে করি না। পৃথিবীর বুকে প্রকাশিত অগুনতি বই, লাইব্রেরিতে ঠাসা সমুদ্র সমান জ্ঞান, অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা আকাশ সমান তথ্য থেকে দু-একটি তুলে এনে পাঠকদেসামনে রাখাই এই ব্লগসাইটের কাজ। তবে জ্ঞানত কোনও ভুল,বিকৃত বা অন্ধ ভাবনার তথ্য প্রকাশ করবে না ‘খোশখবর’।]

0 মন্তব্যসমূহ