খোশখবর ডেস্কঃ ভালবাসা নয়, বাঘকে প্রাথমিকভাবে ভয়ই পায় মানুষ। তবুও এই নরখাদকের সংরক্ষণের জন্য লড়ে যাচ্ছে গোটা বিশ্ব। কিন্তু কেন বাঘ বাঁচাতে উঠেপড়ে লেগেছে মানুষ? আসলে বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের সর্বোচ্চ স্তরের শিকারি (Apex Predator) হিসেবে বাঘ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা ভারসাম্য বজায় রাখে। বাঘ বনাঞ্চলের শীর্ষ শিকারি এবং আমব্রেলা প্রজাতি (Umbrella Species)।
বাঘ শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়, বরং একটি সুস্থ বনভূমি ও পরিবেশের প্রতীক। অর্থাৎ, বাঘকে রক্ষা করা মানে গোটা বনভূমি এবং সেই বনভূমির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদকে রক্ষা করা। বাঘেদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন সুস্থ বনাঞ্চল এবং পর্যাপ্ত শিকার। এই ভারসাম্যের একটি অংশও যদি নষ্ট হয়, তাহলে পুরো বাস্তুতন্ত্রই বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
কেন পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’
প্রতি বছর ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস (Global Tiger Day বা International Tiger Day) এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হল বাঘ সংরক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং বিপন্ন এই প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এই দিনে বিশ্বজুড়ে বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ এবং স্থায়ী উন্নয়নের প্রতি মানুষের অঙ্গীকারকে ফিরে দেখা বা চর্চায় আনা হয়।
আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের সূচনা হয় ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত টাইগার সামিটে। রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাঘ সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর উদ্যোগেই রাশিয়ান জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি-র অধীনে আমুর টাইগার সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ এর লক্ষ্য ছিল ভারতসহ বাঘের বাসস্থান থাকা ১৩টি দেশে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বন্য বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা। এর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাঘবিহীন দেশেও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বাঘের সংরক্ষণে জীববৈচিত্র্যর কী কী লাভ?
সোজা কথায় বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণে বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। আগেই বলা হয়েছে বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, বরং গোটা বনজ বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘের জন্য বন সংরক্ষিত থাকলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রকৃতি, জলবায়ু এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরও। বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষা করা হলে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত থাকে। একই সঙ্গে বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী, ঝরনা ও জলাশয়ও সুরক্ষিত হয়।
বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরাগায়নে সহায়তা। বনাঞ্চলে বসবাসকারী নানা ধরনের পোকামাকড়, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী ফুলের পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা উদ্ভিদের বংশবিস্তার ও কৃষির জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।বিশেষজ্ঞরা জানান, সুস্থ বন স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। বন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র বজায় রাখতে সহায়ক হয়।
বাঘ সংরক্ষণে বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে ভারত
ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য বলছে বাঘ সংরক্ষণে ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। বর্তমানে বিশ্বের মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭০ শতাংশই ভারতের বনাঞ্চলে বাস করে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভারতের বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে বাঘ ও তাদের বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ভারত।
ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঘের সম্পর্ক গভীর। এই ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে ১৯৭২ সালে ভারত সরকার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে জাতীয় প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করে। আসলে বাঘ ভারতের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত সম্পদ এবং প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। প্রাচীন মুদ্রা, সিলমোহর, ভাস্কর্যে সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বাঘের চিত্র দেখা যায়।
ভারতে বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি
ভারত প্রতি চার বছর অন্তর বন্য বাঘের সংখ্যা গণনা করে। উইকিপিডিয়ার দেওয়া তথ্য অনুসারে ভারতে ২০০৬ সালে ছিল ১,৪১১টি বাঘ। ২০১০ সালে ছিল ১,৭০৬টি, ২০১৪ সালে ছিল ২,২২৬টি এবং ২০১৮ সালে ছিল ২,৯৬৭টি। এরপর ২০২২ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩,১৬৭টি এবং ২০২৩ সালে ৩,৬৮২টি।
ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুসারে ২০১০ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৩,২০০টি বন্য বাঘ ছিল। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪,৫০০-এ পৌঁছায়। সাম্প্রতিক হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫,৭১১টি বন্য বাঘ রয়েছে, যা ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় ৭৮ শতাংশ বেড়েছে।
চরম আবহাওয়া এবং বাঘেদের বেঁচে থাকা
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (WWF) এর তথ্য জানাচ্ছে পৃথিবীতে চরম আবহাওয়ার প্রভাব শুধু মানুষ নয়, তা পড়ছে বন্যপ্রাণীর ওপরও, বিশেষ করে বাঘের ওপর। চরম আবহাওয়া যখন বাঘ ও তাদের বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, বনাঞ্চলে দাবানলের সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বাঘের বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বনাঞ্চলের জলাশয় ও হ্রদ দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে, যা বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলের উৎস। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় WWF নেপাল সহ বিভিন্ন দেশে জলাভূমি ও জলাশয় তৈরি এবং পুনরুদ্ধার, দাবানলের বিপদ কমানো সহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তথ্যঃ ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (WWF), উইকিপিডিয়া
পিন্টারেস্টে ‘খোশখবরের’ আশ্চর্য দুনিয়া।ক্লিক করুন এই লিঙ্কে
[ছবি সৌজন্যঃ খোশখবর সাইটে ব্যবহৃত ছবিগুলি নেওয়া হয়েছে পিক্সাবে, আনস্প্ল্যাস, ফ্রিপিক, উইকিমিডিয়া কমন্স, গুগল ফটো সহ বিভিন্ন নিজস্ব সূত্র থেকে]
[ জ্ঞান বা তথ্যের কোনও কপিরাইট হয় বলে আমরা মনে করি না। পৃথিবীর বুকে প্রকাশিত অগুনতি বই, লাইব্রেরিতে ঠাসা সমুদ্র সমান জ্ঞান, অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা আকাশ সমান তথ্য থেকে দু-একটি তুলে এনে পাঠকদেসামনে রাখাই এই ব্লগসাইটের কাজ। তবে জ্ঞানত কোনও ভুল,বিকৃত বা অন্ধ ভাবনার তথ্য প্রকাশ করবে না ‘খোশখবর’।]



.jpg)
.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ