খোশখবর ডেস্কঃ জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড দাবদাহে যেন এক পশলা বৃষ্টি। সোশ্যাল মিডিয়ার বিরামহীন শোরগোল আর যান্ত্রিকতার এই যুগে আমাদের মনোযোগের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে ঠিক তখনই দর্শকদের হালকা অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে আশ্চর্য সব শিল্প সৃষ্টির ডালি নিয়ে হাজির হলেন নৃত্যকাঞ্চনের শিল্পীরা।
নিস্তব্ধতা ভেঙেই সেতারের সুর, সারেঙ্গির ধ্বনি, তবলার তাল আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের টানটান মুহূর্তকে সঙ্গী করেই জেগে উঠল ঘুঙুরের সম্মিলিত ঝঙ্কার। ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’র ভিড়ে আমরা যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই ধ্রুপদী শিল্পের আয়োজন আমাদের অন্তরে প্রশান্তি ফিরিয়ে দেয় বৈকি। ২২ মে, শুক্রবার শ্রীরামপুর নৃত্যকাঞ্চন আয়োজিত ‘ধুন’ শিরোনামের ক্লাসিকাল ডান্স এন্ড মিউজিক কনফারেন্সটি ছিল তেমনই এক উপস্থাপনা।
২০০১ সাল থেকে পথ চলা শুরু করা শ্রীরামপুর নৃত্যকাঞ্চন আজ আর কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শুদ্ধ কথক চর্চার একটি নির্ভরযোগ্য পিঠস্থান। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা ঘরানাভিত্তিক আভিজাত্যকে লালন করে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জাতীয় স্তরের স্কলারশিপ অর্জনের পাশাপাশি ‘কলা উৎসব’-এর মঞ্চেও শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা ছিনিয়ে এনেছে।
উত্তরপাড়া গণভবনে ‘ধুন’ অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষত্ব ছিল বাদ্যযন্ত্র ও গায়নের জীবন্ত পরিবেশনা। যান্ত্রিক ট্র্যাকের বদলে লাইভ মিউজিকের ব্যবহার কথক নৃত্যের মেজাজকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।মঞ্চে গুণী শিল্পীদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘কনফারেন্স’-এর রূপ দিয়েছিল।
কথক কেবল একটি নাচ নয়, এটি শারীরিক ও মানসিক সংযোগের এক আধ্যাত্মিক বহিঃপ্রকাশ।এই ঘরানার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো এর দ্রুত পদচালন, গতি এবং বিভাব। নৃত্যকাঞ্চনের কর্ণধার প্রতিভা দাসের সুদক্ষ নির্দেশনায় শিল্পীরা এই কারিগরি নিপুণতা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন।
কথক নৃত্য কেবল অঙ্গসঞ্চালন নয়, বরং সূক্ষ্ম ‘ভাব’ বা অভিব্যক্তির মাধ্যমে একটি গল্পকে জীবন্ত করে তোলা। শিক্ষার্থী হলেও ‘চক্কর’-এর নিখুঁত ভারসাম্য এবং লয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে দর্শকদের মনে ছাপ ফেলেছে বন্যা সাহা, অবন্তিকা মজুমদার, শুভশ্রী ব্যানার্জি, শ্রীতনুকা নাথ, আরিশা দত্তর সম্মিলিত নৃত্য। আলাদা করে নজর কেড়েছে ইন্দ্রাক্ষী মজুমদার, আরাধ্যা ব্যানার্জি, শরণ্যা ব্যানার্জীর নাচ।
লাইভ মিউজিক বা সরাসরি যন্ত্রসঙ্গীতের ঝঙ্কার এই অনুষ্ঠানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।এদিন বাদ্যযন্ত্রে ও গানে সঙ্গত করেছেন স্বনামখ্যাত শিল্পীরা। সেতারে ছিলেন চন্দ্রচূড় ভট্টাচার্য, কণ্ঠে জয়দীপ সিনহা, তবলায় প্রতীক মুখার্জী, সারেঙ্গিতে কমলেশ মিশ্র।
এঁদের সম্মিলিত সুরের জাল যখন বিস্তার লাভ করছিল, তখন তবলা লহরার দরবারি জৌলুসের সঙ্গে শিল্পীদের পদচালনার এক অপূর্ব রসায়ন তৈরি হয়। বিশেষ করে শিল্পী ইমন মজুমদার, হৃষীক বসু এবং স্বয়ম বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবেশনা ছিল চোখে পড়ার মতো। দর্শকাসনে প্রখ্যাত তবলা বাদক অনুপ দত্ত এবং সলিল মহলানবিশ-এর মতো কিংবদন্তিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির গরিমা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
নৃত্যকাঞ্চনের ‘ধুন’ কেবল একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ছিল না, এটি ছিল আমাদের আদি ঐতিহ্যের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন। এদিন দর্শকদের সঙ্গে মঞ্চ ও শিল্পীদের যোগসূত্র তৈরির কাজটি অসাধারণ নিপুণতায় সম্পন্ন করেন দেবাশিস ভট্টাচার্য ও দিশা ভট্টাচার্য।
সুর, তাল আর ছন্দের এই অপূর্ব মিলন দর্শকদের মনে করিয়ে দিল যে ধ্রুপদী শিল্প চিরন্তন এবং তা সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। এই আয়োজন প্রমাণ করেছে যে, আজকের যুগেও ধ্রুপদী নৃত্যের সম্মোহনী শক্তি অম্লান এবং সঠিক চর্চার মাধ্যমে একে বিশ্বজুড়ে আরও সমাদৃত করা সম্ভব। এই কাজটিই আগামী দিনে আরও গভীরভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় নৃত্যকাঞ্চন।
পিন্টারেস্টে ‘খোশখবরের’ আশ্চর্য দুনিয়া।ক্লিক করুন এই লিঙ্কে
[ছবি সৌজন্যঃ খোশখবর সাইটে ব্যবহৃত ছবিগুলি নেওয়া হয়েছে পিক্সাবে, আনস্প্ল্যাস, ফ্রিপিক, উইকিমিডিয়া কমন্স, গুগল ফটো সহ বিভিন্ন নিজস্ব সূত্র থেকে]
[ জ্ঞান বা তথ্যের কোনও কপিরাইট হয় বলে আমরা মনে করি না। পৃথিবীর বুকে প্রকাশিত অগুনতি বই, লাইব্রেরিতে ঠাসা সমুদ্র সমান জ্ঞান, অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা আকাশ সমান তথ্য থেকে দু-একটি তুলে এনে পাঠকদের সামনে রাখাই এই ব্লগসাইটের কাজ। তবে জ্ঞানত কোনও ভুল,বিকৃত বা অন্ধ ভাবনার তথ্য প্রকাশ করবে না ‘খোশখবর’।]








.jpeg)
0 মন্তব্যসমূহ