একনজরে

10/recent/ticker-posts

Story of Biriyani বিরিয়ানির জন্ম কী ভারতে? আসল, নকল ও নানা বিরিয়ানির খোশ গল্প


খোশখবর ডেস্কঃ বিরিয়ানি খেয়ে বড় ঢেকুর তুলে ‘আহা কী খেলাম’ বলেন নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।অফিসের ব্রিফিং সেশন হোক বা বিয়েবাড়ি সর্বত্রই বিরিয়ানির জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। হাট থেকে হোটেল, রান্নাঘর থেকে রেস্তোরা একটু ঢুঁ মারলেই মিলে যাবে বিরিয়ানি। এই মুহূর্তে বিরিয়ানি ভারতের অন্যতম এমন এক জনপ্রিয় খাবার এবং এমন এক সুগন্ধি পদ, যা একাই পূর্ণাঙ্গ খাবারের স্বাদ এনে দেয়।শুধু খাবার নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে বিরিয়ানি। খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন হায়দরাবাদ, কলকাতা, লখনউ বা মালাবার—ভারতের প্রতিটি অঞ্চলের বিরিয়ানির স্বাদ যেমন আলাদা, তেমনই আলাদা তার ইতিহাস।তবে একটি প্রশ্ন ঘিরে চর্চা চলে সর্বত্র— বিরিয়ানির জন্ম কি ভারতে, নাকি এর শিকড় অন্য কোথাও?



বিরিয়ানি এল কোথা থেকে?

খাদ্যের ইতিহাস নিয়ে যারা চর্চা করেন তাঁদের মতে, বিরিয়ানির উৎপত্তি বর্তমান ইরান (প্রাচীন পারস্য)-এ। ‘বিরিয়ানি’ শব্দটি এসেছে ফারসি ‘বিরিয়ান’ (Birian) বা ‘বিরিঞ্জ বিরিয়ান’ (Birinj Biriyan) শব্দ থেকে, যার অর্থ রান্নার আগে ভেজে নেওয়া চাল। পারস্যে মাংস ও চালকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে ধীর আঁচে বা 'দম'-এ রান্না করার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, সেখান থেকেই বিরিয়ানির সূচনা বলে মনে করেন গবেষকরা।

গুগলে আরও খোশখবর


সাধারণ ধারণা হলো, মুঘলরা বিরিয়ানি ভারতে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বলা হয় এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বিবিসি তাদের এক রিপোর্টে বিভিন্ন ইতিহাসবিদদের ভাবনা তুলে ধরে জানিয়েছে যে অভিজাত বংশের তীর্থযাত্রী, সেনাপতি ও শাসকরা দক্ষিণ ভারতের দাক্ষিণাত্য (ডেকান) অঞ্চলে বিরিয়ানি নিয়ে আসেন। পরে ধীরে ধীরে এই খাবার উপকূলীয় অঞ্চল ও উপদ্বীপের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্রতিটি অঞ্চলের স্থানীয় উপকরণ, মশলা ও স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বিরিয়ানি নানা রূপ ধারণ করে।


যদিও একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি আছে যে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহল সেনাদের অপুষ্টি দূর করতে রাঁধুনিকে চাল, মাংস ও মশলা দিয়ে পুষ্টিকর একপাত্র খাবার তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকেই বিরিয়ানির জন্ম। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই কাহিনির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।


উপকরণের ম্যাজিক ও বিরিয়ানি

প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে বিরিয়ানি তৈরির জন্য লাগে ভাল চাল। দীর্ঘ দানার বাসমতি চাল বিরিয়ানির জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবে বলা হয় মালাবার, থালাসেরি বা আম্বুরের মতো আঞ্চলিক বিরিয়ানিতে জিরাকাসালা বা সীরাগা সাম্বা চাল ব্যবহার করা হয়, যা সুগন্ধ ও স্বাদ ভালোভাবে ধরে রাখে। পাশাপাশি বিরিয়ানিতে ব্যবহার করা হয় নানা সুগন্ধী মশলা।যেমন জিরা,এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা, জয়ত্রী, জায়ফল, গোলমরিচ, শাহী গরম মশলা, জাফরান এবং ভাজা পেঁয়াজ। যদিও অঞ্চলভেদে ও বিরিয়ানির রকমভেদে মশলার ধরন ও পরিমাণ আলাদা আলাদা হয়।



প্রকৃত বিরিয়ানি মানেই ‘দম’ বিরিয়ানি?

খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরিয়ানির আসল স্বাদ লুকিয়ে থাকে ঐতিহ্যবাহী 'দম' পদ্ধতিতে রান্নার মধ্যে। বলা হয় ইরানে একটি বড় পাত্রে (দেগ) মাংস ও চাল স্তরে স্তরে সাজিয়ে ধীর আঁচে (দম) রান্না করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাংস নিজের রসে ধীরে ধীরে সিদ্ধ হয় এবং চাল সুগন্ধি মশলার সঙ্গে মিশে অসাধারণ স্বাদ তৈরি করে। রান্নার শুরুতে চাল হালকা ভেজেও নেওয়া হয়।

                                     জেনে নিন ' চকোলেট এল কেমন করে?'

কিন্তু আজকাল বিভিন্ন জায়গায় আলাদা করে রান্না করা চাল ও মাংস পরে এক জায়গায় করা হয়, যা আসল বিরিয়ানির স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য থেকে অনেকটাই আলাদা। ফলে দুঃখজনকভাবে তাতে মানুষ প্রকৃত বিরিয়ানির স্বাদটাই পান না। অধিকাংশ রেস্তোরাঁয় যে বিরিয়ানি পাতে দেওয়া হয়, তাকে অনেকে ‘ফ্রাইং প্যান বিরিয়ানি’ বলে ডাকেন। সেখানে লম্বা দানার চাল, জাফরানের হালকা হলুদ রং থাকলেও প্রকৃত দম বিরিয়ানির সঙ্গে তার মিল খুবই সামান্য।



ভারতের নানা অঞ্চলের নানা বিরিয়ানি

ভারতেও বিরিয়ানির ইতিহাস কম রঙিন নয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিরিয়ানির রয়েছে নিজস্ব স্বাদ ও পরিচয়। পারস্যে বিরিয়ানির উৎপত্তি হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এসে এই খাবার অসংখ্য আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের মাধ্যমে এক নতুন পরিচয় পেয়েছে। হায়দরাবাদ থেকে কলকাতা, লখনউ থেকে মালাবার—প্রতিটি অঞ্চলের বিরিয়ানি স্থানীয় স্বাদ, উপকরণ ও রান্নার কৌশলের গুণে আলাদা হয়ে দাড়িয়েছে। যেমন হায়দরাবাদি বিরিয়ানি কাচ্চি ও পাক্কি—এই দুই রূপে বিখ্যাত। লখনউ বা আওধি বিরিয়ানি সুগন্ধি ও মৃদু মশলার জন্য পরিচিত। কলকাতার বিরিয়ানি আলু, সেদ্ধ ডিম এবং গোলাপজলের হালকা সুগন্ধের জন্য বিশেষ জনপ্রিয়।


ভারতে সেরা এক ডজন বিরিয়ানি

১। হায়দরাবাদি বিরিয়ানি - ভারতের বিখ্যাত বিরিয়ানিগুলোর মধ্যে অন্যতম।এর দুটি প্রধান ভাগ হল কাচ্চি বিরিয়ানি ও পাক্কি বিরিয়ানি।

২। লখনউ বা আওধি বিরিয়ানি - ঐতিহ্যবাহী দম পদ্ধতিতে রান্না করা হয়। শাহী গরম মশলা এই বিরিয়ানির অন্যতম প্রধান উপাদান। সুগন্ধি স্বাদের জন্য পরিচিত।

৩। কলকাতা বিরিয়ানি - নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ নির্বাসিত হয়ে কলকাতায় এলে তাঁর সঙ্গে এই বিরিয়ানির রান্নার পক্রিয়া চলে আসে। সেই সময় মাংসের অভাব থাকায় বিরিয়ানিতে আলু ও সেদ্ধ ডিম যোগ করা শুরু হয়। থাকে গোলাপজল ও জাফরানের হালকা সুগন্ধ।

৪। ভোপালি বিরিয়ানি - আহমদ শাহ আবদালির সেনাবাহিনীর সঙ্গে আসা দুররানি আফগানদের প্রভাবে এই বিশেষ ধরনের বিরিয়ানির বিকাশ ঘটেছিল। মধ্য ভারতের ভোপাল অঞ্চলে এই মশলাদার বিরিয়ানি রান্না হয়।

৫। মুঘলাই বিরিয়ানি - মুঘলাই বিরিয়ানিতে মাংস দীর্ঘ সময় ধরে মশলা ও দইয়ে মেরিনেট করা হয়। থাকে কাজু, কিশমিশ, জাফরান, ঘি।

৬। মোরাদাবাদি বিরিয়ানি - রাজধানী দিল্লিতে এই বিরিয়ানির চল রয়েছে। উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ শহরের এই বিশেষ রেসিপিই মোরাদাবাদি বিরিয়ানি।

৭. থালাসেরি বিরিয়ানি - স্থানীয় মালাবারি মশলা, ঘি এবং আরব বাণিজ্যের প্রভাব আছে কেরলের মালাবার অঞ্চলের থালাসেরি বিরিয়ানিতে। সুগন্ধি জিরাকাসালা (কাইমা) চাল দিয়ে তৈরি হয়।

৮। 
আম্বুর বিরিয়ানি - ঐতিহ্যগতভাবে এটি কাঠের আগুনে রান্না করা হয়। তামিলনাড়ুর আম্বুর বিরিয়ানি সরল অথচ গভীর স্বাদের জন্য বিখ্যাত। রায়তা ও বেগুনের ঝোলের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।


৯। ডিন্ডিগুল বিরিয়ানি - লেবু, টক দই এবং সীরাগা সাম্বা চাল ব্যবহার করা হয়। তামিলনাড়ুর ডিন্ডিগুল বিরিয়ানি তার হালকা টক স্বাদের জন্য বিখ্যাত।

১০। সিন্ধি বিরিয়ানি - দই, টমেটো এবং বিভিন্ন সুগন্ধি মশলার ব্যবহারে এই বিরিয়ানি ঝাল, মশলাদার ও টক স্বাদের জন্য সুপরিচিত।

১১। মেমনি বিরিয়ানি – এই বিরিয়ানি তুলনামূলকভাবে কম তেলযুক্ত। গুজরাট-সিন্ধ অঞ্চলের এই বিরিয়ানিতে টমেটোর ব্যবহার কম হলেও ঝাল ও মশলার তীব্রতা অনেক বেশি।

১২। মালাবার বিরিয়ানি - নারকেল, ভাজা পেঁয়াজ, কাজুবাদাম এবং হালকা মশলার সহযোগে কেরলের উপকূলীয় অঞ্চলের মালাবার বিরিয়ানি ছোট দানার জিরাকাসালা চাল দিয়ে রান্না করা হয়।

পিন্টারেস্টে ‘খোশখবরের’ আশ্চর্য দুনিয়া।ক্লিক করুন এই লিঙ্কে


[ছবি সৌজন্যঃ খোশখবর সাইটে ব্যবহৃত ছবিগুলি নেওয়া হয়েছে পিক্সাবে, আনস্প্ল্যাস, ফ্রিপিক, উইকিমিডিয়া কমন্স, গুগল ফটো সহ বিভিন্ন নিজস্ব সূত্র থেকে]

[ জ্ঞান বা তথ্যের কোনও কপিরাইট হয় বলে আমরা মনে করি না। পৃথিবীর বুকে প্রকাশিত অগুনতি বই, লাইব্রেরিতে ঠাসা সমুদ্র সমান জ্ঞান, অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা আকাশ সমান তথ্য থেকে দু-একটি তুলে এনে পাঠকদেসামনে রাখাই এই ব্লগসাইটের কাজ। তবে জ্ঞানত কোনও ভুল,বিকৃত বা অন্ধ ভাবনার তথ্য প্রকাশ করবে না ‘খোশখবর’।]  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ad Code