একনজরে

10/recent/ticker-posts

Great Technological Inventions যে ১০ প্রযুক্তিগত আবিষ্কার মানবসভ্যতার গতিপথ পাল্টে দিয়েছে

 

খোশখবর ডেস্কঃ বলা হয় মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস আসলে প্রযুক্তির ইতিহাস। গুটেনবার্গের ছাপাখানা বা মুদ্রণযন্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক এআই—প্রতিটি আবিষ্কারই মানুষের চিন্তা, কাজ এবং জীবনযাত্রাকে নতুনভাবে তৈরি করেছে। আজকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দাঁড়িয়ে আমরা যদি মানুষের প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে প্রথম দিকের এগিয়ে চলার দিনগুলোর কথা ভাবি তাহলে অবাক হতে হয়।


ভাবুন তো, বই ছাপার মেশিন, টেলিফোন, কিংবা ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ছাড়া আজকের পৃথিবী কেমন হতো? মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু প্রযুক্তিগত আবিষ্কার রয়েছে, যেগুলো শুধু মানুষের জীবনকে সহজ করেনি, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, পরিবহন এবং শিল্প-বাণিজ্যের পুরো কাঠামোকেই বদলে দিয়েছে। চলুন এক ঝলকে জেনে নেওয়া যাক বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব ফেলা ১০টি প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের গল্প।

গুগলে আরও খোশখবর 


 
১. মুদ্রণযন্ত্র (Printing Press)

আবিষ্কারের সময়: ১৪৫০-এর দশক
উদ্ভাবক: জোহানেস গুটেনবার্গ (জার্মানি)


মানব ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হলো ছাপার যন্ত্র বা মুদ্রণযন্ত্র। ১৫শ শতাব্দীতে জার্মান স্বর্ণকার ও বিজ্ঞানী জোহানেস গুটেনবার্গ তুলে তুলে বসানো যায় এমন ধাতুর টাইপ (Movable Type) ব্যবহার করে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র তৈরি করেন। মনে রাখতে হবে এর আগে বই সম্পূর্ণ হাতে লেখা হতো। ফলে বই ছিল অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল। গুটেনবার্গের যন্ত্র বইয়ের উৎপাদনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, রেনেসাঁ হোক বা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বা বৈজ্ঞানিক বিপ্লব—সব ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তির অবদান ছিল অসামান্য। মজার তথ্য হল গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্রে ছাপা প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই ছিল গুটেনবার্গ বাইবেল।



২. বাষ্পীয় ইঞ্জিন (Steam Engine)

উন্নত সংস্করণ: ১৭৭৫
উদ্ভাবক: জেমস ওয়াট (স্কটল্যান্ড)


বলা হয় বাষ্পচালিত যন্ত্রের ধারণা আগে থেকে থাকলেও স্কটিশ ইঞ্জিনিয়ার জেমস ওয়াট ১৭৭৫ সালে এটিকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করে তোলেন। আর এর ফলেই শুরু হয় প্রথম শিল্প বিপ্লব। কারখানার উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়, রেলপথ বিস্তৃত হয় এবং বাষ্পচালিত জাহাজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নতুন গতি দেয়। এই প্রযুক্তিই পরবর্তীকালে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার সূচনা করে।



৩. টেলিফোন (Telephone)

আবিষ্কারের বছর: ১৮৭৬
উদ্ভাবক: আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল


আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের টেলিফোন আবিষ্কারেই প্রথমবারের মতো মানুষ দূরের কারও কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। বেলের প্রথম টেলিফোন বার্তা ছিল—"Mr. Watson, come here, I want to see you."। ১৮৭৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোনের পেটেন্ট গ্রহণ করেন। মনে রাখতে হবে সেটাই শুরু, আজকের মোবাইল ফোন, ভিডিও কল কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের সূচনা কিন্তু এই আবিষ্কারের হাত ধরেই। ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, জরুরি সেবা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই টেলিফোন যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।


৪. বৈদ্যুতিক বাতি (Light Bulb)

জনপ্রিয় সংস্করণ: ১৮৮০
উন্নয়নে অবদান: টমাস আলভা এডিসন


বৈদ্যুতিক বাতির উদ্ভাবন এককভাবে এডিসনের না হলেও এই আবিষ্কারের পিছনে বসে যায় টমাস আলভা এডিসনের নাম। যদিও তাঁর আগে হামফ্রি ডেভি, জোসেফ সোয়ানসহ আরও অনেক গবেষক এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন। তবে এডিসন দীর্ঘস্থায়ী ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বৈদ্যুতিক বাতি তৈরি করে বিশ্বজুড়ে এর ব্যবহার জনপ্রিয় করেন।

ইলেকট্রিকের আলো বা বৈদ্যুতিক বাল্ব যেন মানুষের কাছে আরও এগিয়ে চলার আলো এনে দিল। অন্ধকার সরিয়ে মানুষের কাজ করার কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে দিল। কারখানা, হাসপাতাল, স্কুল, অফিস এবং শহুরে জীবন নতুন রূপ পেল। বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্পেরও দ্রুত বিকাশ ঘটল।


৫. কোডাক ক্যামেরা (Kodak Camera)

আবিষ্কারের বছর: ১৮৮৮
উদ্ভাবক: জর্জ ইস্টম্যান


অনেকেই ভাবতে পারেন ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা আবিষ্কার আগেই হয়ে গিয়েছিল, তাহলে কোডাক ক্যামেরাকে কেন আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? আসলে একসময় ছবি তোলা ছিল শুধু পেশাদার আলোকচিত্রীদের কাজ। বড় ক্যামেরা, কাঁচের প্লেট এবং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল ফটোগ্রাফি। ১৮৮৮ সালে জর্জ ইস্টম্যান আনেন কোডাক ক্যামেরা যা মানুষের ছবি তোলাকে করে দিল অতি সহজ। কোডাকের বিখ্যাত স্লোগান ছিল—"You press the button, we do the rest." মোট কথা এই উদ্ভাবনের ফলে ফটোগ্রাফি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠল। ক্যামেরাটিতে আগে থেকেই ১০০টি ছবি তোলার ফিল্ম থাকত। ছবি শেষ হলে কারখানায় ছবি প্রিন্ট করে নতুন ফিল্মসহ ক্যামেরা ফেরত দেওয়া হতো।



৬. বিমান (Aeroplane)

প্রথম সফল উড্ডয়ন: ১৭ ডিসেম্বর, ১৯০৩
উদ্ভাবক: রাইট ভ্রাতৃদ্বয়


পাখির মত কবে ওড়া সম্ভব হবে, এই ছিল একসময় মানুষের ভাবনা। প্রথমে গ্যাস বেলুন, হাওয়া বেলুনের মাধ্যমে আকাশে ওড়ার চেষ্টা করা হলেও আসল লক্ষ্যে পৌঁছলেন রাইট ভ্রাতৃদ্বয়। অরভিল ও উইলবার রাইটের তৈরি Wright Flyer ছিল বিশ্বের প্রথম সফল ইঞ্জিনচালিত মানববাহী বিমান। প্রথম উড়ান মাত্র ১২ সেকেন্ড স্থায়ী হলেও সেটিই আধুনিক বিমান চলাচলের ভিত্তি স্থাপন করে। সেই সাফল্য দুনিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পাল্টে দিয়েছে। আজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন, জরুরি চিকিৎসা, পণ্য পরিবহন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগে বিমান অপরিহার্য।


৭. ব্যক্তিগত কম্পিউটার (Personal Computer)

গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল: ১৯৭১–১৯৭৫

আজকের দিনে কম্পিউটার ছাড়া কোনও কাজই প্রায় অসম্ভব। আজ শিক্ষা, গবেষণা, ব্যাংকিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই কম্পিউটার অপরিহার্য। কম্পিউটার আবিষ্কার কিন্তু একদিনে হয় নি। তবে ব্যক্তিগত কম্পিউটারের যুগ শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে।

ট্রানজিস্টর আবিষ্কার, প্রথম মাইক্রোপ্রসেসর, Micral কম্পিউটার- এর সময় পেরিয়ে আসে আধুনিক কম্পিউটার। Altair 8800-এর জন্য বিল গেটস ও পল অ্যালেন তৈরি করেন Microsoft BASIC, যা পরবর্তীকালে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।



৮. ইন্টারনেট (Internet)

শুরু: ১৯৬৯ (ARPANET)
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব: ১৯৯১


কম্পিউটার সঙ্গে থাকলেও আজকের দিনে ইন্টারনেট ছাড়া তা যেন অচল। কম্পিউটারে ইন্টারনেট থাকলেই যেন গোটা বিশ্ব আমাদের চোখের সামনে চলে আসে। আজ ইন্টারনেট ছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, ই-কমার্স, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ এবং দূরবর্তী কাজের কথা কল্পনাও করা যায় না।

১৯৬৯ সালে আমেরকায় ARPANET-এর মাধ্যমে চারটি কম্পিউটার প্রথমবার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর ১৯৯১ সালে টিম বার্নার্স-লি World Wide Web (WWW) চালু করেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের পথ সহজ করে দেয়।


৯. মোবাইল ফোন (Mobile Phone)

প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল: ১৯৮৩
ইঞ্জিনিয়ার: মার্টিন কুপার


আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের টেলিফোন আবিষ্কারে ফোন তো আগেই এসেছিল, ১৯৮৩ সালে বাজারে আসে বিশ্বের প্রথম নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় এমন ফোন বা মোবাইল ফোন। মার্টিন কুপারের তৈরি প্রথম এমন ফোনের এর ওজন ছিল প্রায় ৮০০ গ্রাম এবং ব্যাটারি টিকত মাত্র ৩০ মিনিট। আজকের স্মার্টফোন ক্যামেরা, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ব্যাংক, মানচিত্র, সংগীত প্লেয়ার এবং অফিস—সবকিছুর কাজ একাই করতে পারে। স্মার্টফোন মানে হাতের মুঠোয় রাখা এক কম্পিউটার। বর্তমানে বিশ্বে স্মার্টফোন ব্যবহার কয়েকশো কোটি মানুষ।


১০. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)

AI শব্দের প্রচলন: ১৯৫৬

আজকে AI নিয়ে গোটা বিশ্বে হইচই পড়ে গেলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন অ্যালান টিউরিং। তবে বলা হয় "Artificial Intelligence" শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ সম্মেলনে।

আজ AI ব্যবহার করা হচ্ছে চ্যাটবট-এর কাজে, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে, স্বয়ংচালিত গাড়ি, চিকিৎসা নির্ণয়, রোবোটিক্স, ভাষা অনুবাদ ও কনটেন্ট তৈরি, স্মার্ট কারখানা চালানো ইত্যাদি কাজে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে AI মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে পরিণত হবে।

গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—প্রতিটি আবিষ্কারই মানুষের চিন্তা, কাজ এবং জীবনযাত্রাকে নতুনভাবে পথ দেখিয়েছে। এই ১০টি প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল এটাই যে কোনোটিই একা পৃথিবীকে বদলে দেয়নি। বরং প্রতিটি আবিষ্কার পরবর্তী উদ্ভাবনের ভিত্তি তৈরি করেছে।


পিন্টারেস্টে ‘খোশখবরের’ আশ্চর্য দুনিয়া।ক্লিক করুন এই লিঙ্কে


[ছবি সৌজন্যঃ খোশখবর সাইটে ব্যবহৃত ছবিগুলি নেওয়া হয়েছে পিক্সাবে, আনস্প্ল্যাস, ফ্রিপিক, উইকিমিডিয়া কমন্স, গুগল ফটো সহ বিভিন্ন নিজস্ব সূত্র থেকে]

[ জ্ঞান বা তথ্যের কোনও কপিরাইট হয় বলে আমরা মনে করি না। পৃথিবীর বুকে প্রকাশিত অগুনতি বই, লাইব্রেরিতে ঠাসা সমুদ্র সমান জ্ঞান, অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা আকাশ সমান তথ্য থেকে দু-একটি তুলে এনে পাঠকদেসামনে রাখাই এই ব্লগসাইটের কাজ। তবে জ্ঞানত কোনও ভুল,বিকৃত বা অন্ধ ভাবনার তথ্য প্রকাশ করবে না ‘খোশখবর’।]  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ad Code