একনজরে

10/recent/ticker-posts

World's Most Expensive Tea দুনিয়ার সবচেয়ে দামি চা, কোটি টাকা দামের ‘দা হং পাও’ –এর অবিশ্বাস্য গল্প

 


খোশখবর ডেস্কঃ এই চা এক কাপ খেতে গেলেই বিকিয়ে যেতে পারে আপনার সমস্ত স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি। আর আপনার যদি সে সঙ্গতি না থাকে তা হলে কোনওদিন চুমুকই দিতে পারবেন না এমন বিরলতমদের মধ্যে বিরল এই চায়ে। কারণ বিশ্বের বাজারে এই চায়ের দাম কেজি প্রতি প্রায় ৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ২০ গ্রাম চায়ের জন্য খরচ করতে হবে ১ লক্ষ টাকারও বেশি! তবে সে স্বাদ না পেলেও তার সম্পর্কে জানতে তো বাধা নেই, তাই খোশখবরের পাতায় জেনে নিন দুনিয়ার সবচেয়ে দামি চা, ‘দা হং পাও’ (Da Hong Pao) –এর অবিশ্বাস্য গল্প।



চা নিয়ে এক চিনা লোককাহিনি

‘দা হং পাও’- এর কথা জানতে গেলে চলে আসে এক চিনা লোককাহিনির কথা। উইকিপিডিয়া অনুসারে বহু বছর আগে এক তরুণ পণ্ডিত সম্রাটের পরীক্ষায় অংশ নিতে বেইজিং যাওয়ার পথে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। উইই পর্বতের তিয়ানশিন মন্দিরের এক সন্ন্যাসী পাহাড়ের চা-পাতা দিয়ে তাঁকে এক পেয়ালা চা পান করান। সেই চা পান করে তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং কয়েকদিন পর পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।

গুগলে আরও খোশখবর 


পরবর্তীকালে সম্রাট অসুস্থ হলে তিনি একই চা পান করিয়ে সম্রাটকেও সুস্থ করে তোলেন।সম্রাট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁকে একটি লাল রাজকীয় পোশাক উপহার দেন এবং সেই পোশাকটি চা-গাছের গায়ে পরিয়ে দিতে বলেন। সেই সময় লাল পোশাক ছিল সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক। এরপর থেকে গাছটির নাম হয়ে যায় দা হং পাও, যার অর্থ 'বড় লাল পোশাক'।


কীভাবে তৈরি হয় ‘দা হং পাও’ চা?

শুকনো দা হং পাও-এর পাতা শক্তভাবে পাকানো দড়ির মতো বা ফিতের আকারের হয়। এর রং সবুজ ও বাদামির মিশ্রণ। চা তৈরি করার পর এর রং হয় উজ্জ্বল কমলা-হলুদ এবং স্বচ্ছ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, একই চা-পাতা দিয়ে ন’বার পর্যন্ত চা তৈরি করলেও এর স্বাদ ও সুবাস অনেকটাই অটুট থাকে। আসলে ‘দা হং পাও’-এর স্বাদ ধীরে ধীরে পান করে উপভোগ করতে হয়। প্রথাগতভাবে দা হং পাও তৈরির জন্য চিনা বেগুনি মাটির (Purple Clay) চায়ের পাত্র ব্যবহার করা হয়। এতে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সদ্য ফুটন্ত জল ব্যবহার করাই শ্রেয় বলে মনে করা হয়।


 বিশেষজ্ঞদের মতে, জল ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তা ব্যবহার করা উচিত। দীর্ঘক্ষণ ফুটিয়ে রাখা বা পরে সংরক্ষিত জল ব্যবহার করলে চায়ের স্বাদ নষ্ট হতে পারে। সাধারণ টি-ব্যাগের মতো ‘দা হং পাও’ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয় না। একই চা-পাতা দিয়ে একাধিকবার চা তৈরি করা যায়। একই পাতা দিয়ে একাধিকবার চা তৈরি করা যায়। সাধারণভাবে তৃতীয় ও চতুর্থবারের ইনফিউশন-এ দা হং পাও-এর সবচেয়ে সমৃদ্ধ স্বাদ ও সুগন্ধ অনুভব করা যায়।



বিশ্ব সেরা ‘দা হং পাও’ উৎপাদনে সাত ধাপ

‘দা হং পাও’ উৎপাদনের জন্য সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মেনে চলা হয়। তার মধ্যে প্রথমেই আছে পাতা সংগ্রহ (Picking) করা। প্রতি বছর সাধারণত মে ও জুন মাসে একবারই চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। একটি কুঁড়ি এবং দুই থেকে তিনটি নরম পাতা সংগ্রহ করাই আদর্শ। এবার তাকে শুকানো (Withering) করা হয়। সংগ্রহ করা পাতাগুলি রোদ ও প্রাকৃতিক বাতাসে সমানভাবে ছড়িয়ে রাখা হয়, যাতে পাতার অতিরিক্ত জলীয় অংশ বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এরপর তৃতীয় ধাপে ঠান্ডা করা (Cooling) হয়। এতে প্রাথমিক শুকানোর পর পাতাগুলি ঘরের ভেতরে এনে ঠান্ডা করা হয়। চতুর্থ ধাপে আছে ঝাঁকানো ও গড়ানো (Making)। বলা হয় এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ ধাপ। বাঁশের চালুনিতে পাতাগুলি বারবার ঝাঁকানো ও গড়ানো হয় যাতে পাতার অভ্যন্তরে অক্সিডেশন ঘটে এবং দা হং পাও-এর স্বতন্ত্র সুবাস ও স্বাদ তৈরি হয়।


পঞ্চম ধাপে আছে ভাজা (Stir-frying)। এই ধাপ হাতে বা যন্ত্রের সাহায্যে সম্পন্ন হয়।হাতে ভাজা হয় ১৪০–১৬০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। আর যন্ত্রে ভাজা হয় ২২০–২৬০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। ছ’নম্বর ধাপে আছে পাকানো (Kneading), যাতে পাতাগুলিকে হাত বা যন্ত্রের সাহায্যে পাকিয়ে দড়ির মতো আকৃতি দেওয়া হয়।এরপর সাত নম্বর ধাপে বেকিং (Baking)-যাতে বড় ঝুড়িতে পাতাগুলিকে রেখে বিভিন্ন তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ধরে শুকানো ও বেক করা হয়।


‘দা হং পাও’ চায়ের দাম মাথা ঘুরিয়ে দেবে!

চায়ের দাম শুনে সত্যিই মাথা ঘুরতে পারে আপনার। তথ্য বলছে ২০০৫ সালে মূল গাছের মাত্র ২০ গ্রাম ‘দা হং পাও’ চা ২,০৮,০০০ ইউয়ান দামে নিলামে বিক্রি হয়,যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১.২৩ লক্ষ টাকা। সেটিই এখনও এই চায়ের সর্বোচ্চ নিলামমূল্যের রেকর্ড। এনডিটিভির রিপোর্টে দেওয়া বিবিসির এক তথ্য অনুযায়ী, আসল দা হং পাও-এর প্রতি গ্রাম চায়ের মূল্য ১,৪০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি (প্রায় ১.২ লক্ষ টাকা)। অর্থাৎ ওজনের হিসাবে এটি সোনার চেয়েও ৩০ গুণ বেশি মূল্যবান। বলা হচ্ছে ‘দা হং পাও’ –এর আসল পাতা দিয়ে তৈরি এক পাত্র চায়ের দাম ১০,০০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৮.৫ লক্ষ টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে। আসলে বর্তমানে বাজারে যে দা হং পাও পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই মূল গাছের কলম (ক্লোন) থেকে উৎপন্ন। এগুলির গুণমানের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারিত হয় এবং মূল গাছের চায়ের তুলনায় অনেক কম।



‘দা হং পাও’ চা কোথায় আলাদা?

‘দা হং পাও’ (Da Hong Pao) হল চিনের ফুজিয়ান প্রদেশের উইই পর্বতমালা অঞ্চলে উৎপন্ন এক বিখ্যাত উইই রক উলং চা। অনন্য অর্কিড-সুগন্ধ, দীর্ঘস্থায়ী মিষ্টি টেস্ট এবং বিরলতার জন্য এই চা তার অনন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। চিন দেশে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক। বলা হয় ছিং রাজবংশের সময় ‘দা হং পাও’ স্থানীয় চা প্রতিযোগিতায় প্রায়ই প্রথম স্থান অধিকার করে 'চায়ের রাজা' উপাধি লাভ করেছিল। প্রতি বছর চা-পাতা সংগ্রহের আগে স্থানীয় মানুষ ফুল, ফল এবং পশু উৎসর্গ করে এই চা-গাছের পূজা করতেন।



এত দাম কেন? ‘দা হং পাও’ আসল চা পাওয়াই যায় না?

ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী উইই পর্বতমালা অঞ্চল বিশ্বের সেরা চাগুলির অন্যতম উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এনডিটিভি ডট কম প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে উইই পর্বতমালার খাড়া পাহাড়ের গায়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে মাত্র ছটি আসল দা হং পাও গাছ, যেগুলিকে 'মাদার ট্রি' নামে ডাকা হয়। কয়েকশো বছর বয়সের এই গাছগুলিরকে চিনের জাতীয় ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়। মাত্র ছটি গাছ থেকে উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই বিরল প্রাপ্তির কারণেই এর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। প্রকৃত ‘দা হং পাও’-এর মূল্য কেজিপ্রতি ৯ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

২০০৬ সালে স্থানীয় প্রশাসন এই ছটি গাছের ১০ কোটি রেনমিনবি (RMB) [ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪২ কোটি টাকা ] মূল্যের বীমা করায় এবং সেগুলি থেকে ব্যক্তিগতভাবে চা-পাতা সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। মূল গাছ থেকে তোলা শেষ চা বর্তমানে বেজিংয়ের প্যালেস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে বাজারে যে দা হং পাও বিক্রি হয়, তা মূল গাছের কলম (ক্লোন) থেকে উৎপন্ন চা অথবা উৎকৃষ্ট মানের উইই রক উলং চায়ের বিশেষ মিশ্রণ - যার স্বাদ মূল চায়ের অনেকটা কাছাকাছি।

তথ্যঃ উইকিপিডিয়া ও এনডিটিভি ডট কম/ ছবি প্রতীকী 

পিন্টারেস্টে ‘খোশখবরের’ আশ্চর্য দুনিয়া।ক্লিক করুন এই লিঙ্কে


[ছবি সৌজন্যঃ খোশখবর সাইটে ব্যবহৃত ছবিগুলি নেওয়া হয়েছে পিক্সাবে, আনস্প্ল্যাস, ফ্রিপিক, উইকিমিডিয়া কমন্স, গুগল ফটো সহ বিভিন্ন নিজস্ব সূত্র থেকে]

[ জ্ঞান বা তথ্যের কোনও কপিরাইট হয় বলে আমরা মনে করি না। পৃথিবীর বুকে প্রকাশিত অগুনতি বই, লাইব্রেরিতে ঠাসা সমুদ্র সমান জ্ঞান, অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা আকাশ সমান তথ্য থেকে দু-একটি তুলে এনে পাঠকদেসামনে রাখাই এই ব্লগসাইটের কাজ। তবে জ্ঞানত কোনও ভুল,বিকৃত বা অন্ধ ভাবনার তথ্য প্রকাশ করবে না ‘খোশখবর’।]  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. এই তথ্য জানা ছিল না। আমি সাধারণত ণত দার্জিলিঙের অর্গানিক চা পাতা পছন্দ করি। আর্ল গ্রে চা পাতাও এখন দার্জিলিঙে পাওয়া যায়। চিন, জাপান, শ্রীলঙ্কার চা ও টেস্ট করেছি। তবে এই বিশেষ
    দুর্লভ চা পান করা হয়নি। এত
    দাম, সম্ভাবনা নেই। তাই পড়েই তেষ্টা মেটাচ্ছি। ধন্যবাদ খোঁজ খবর।

    উত্তরমুছুন
  2. দুঃখিত সম্পাদক খোশখবর। চিনের দুর্মূল্য চা নিয়ে আমার আগের মন্তব্যটি সঠিক হলেও শেষ বাক্যটিতে টাইপো মিস হয়েছে। *ধন্যবাদ খোশখবর* হবে। খোঁজ খবর নয়।

    উত্তরমুছুন

Ad Code